আমার উপর নেই ভুবনের ভার
রঞ্জন ভট্টাচার্য , ব্যারাকপুর।
সত্যিই তো এই ভুবনের ভার তাঁর উপর নেই। কথাটা যথার্থই বলেছেন ডাক্তারবাবু । আজকাল কোনো ডাক্তারবাবু উপর তাঁর পরিবারের ভার নেই তো, ভুবন এর.......... !সে ভাবনা আজ দুরহ....!
সৈনিক নগরে একমাত্র ডাক্তার মিস্টার চ্যাটার্জি, পুরো নাম তারাপদ চ্যাটার্জী,সুঠাম সুন্দর, বয়সের ছাপ এখনো চোখে মুখে স্পর্শ করেনি ।গাড়ি-বাড়ি নিয়ে ছোট্ট সংসার । সুন্দরী রমনী আর একমাত্র ছেলে, সেও ডাক্তার।
-কে? তিতিবিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন
-আজ্ঞে ! আমি গোলাম আলী, পাশের বদ্রি নগরে বাস। ডাক্তারবাবু একবার ভিজিট যাবেন? বাপরটা যে কি হলো রাত থেকে ....,এসব বলতে বলতে গোলামের বাকরুদ্ধ হয়ে এলো।
নতুনপাড়া, রিটায়ার্ড সৈনিকদের সাথে সাথেই ডাক্তার বাবু এখানে বসতি স্থাপন করেন। সেদিন ভোর পাঁচটা সূর্যের রক্তিম আভা রঞ্জিত করেছে পৃথিবীর মুখ । গোলাম আলী ডাক্তারবাবু বাড়িতে কলিংবেল টিপল । সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, বড়লোক! রাত্রি বড় না হলে ঘুম আসে না এঁদের এমনিতে । এভাবেই মিনিট পাঁচেক চলার পর দরজায় সজোরে এক ধাক্কা দিলো গোলাম । মরদ বটে, হাল চাষে এখনো খায় সে ।বাপটার বয়স প্রায় নব্বই এর কাছাকাছি । ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ এলো, -না না , এখন সময় হবে না। সাতটার সময় আসিস । তখন দেখা যাবে । বলতে বলতে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
-না ডাক্তার বাবু, না ! একটা হিল্লে আপনাকে করতে হবে নয়তো বাপটা যে অকালে.....! আপনি না হলে কে দেখবে ডাক্তার ?চলেন , ডাক্তার চলেন...!
ভিতর থেকে ডাক্তার কাব্যরস রসিক হয়ে বললেন ,শোন, " আমার উপর নেই ভুবনের ভার," বাইরে থেকে শুনলো বটে, কিন্তু বুঝলো কিনা বোঝা গেলো না । সে বলল, সে তো ভুবন ডাক্তার অনেক দূরে থাকে তাকে আনইতে আনইতে তো বাপটা এক্কেবারে অক্কা পাবে ডাক্তার !
-সে যাই হোক এখন আমি যেতে পারব না।
-পারব নি বললেন কি হয় ডাক্তার .ডাক্তার মানুষ আপনি. যদি পারবনি বলেন তো আমরা কুথায় যাই ডাক্তার !
-যেখানে পারিস যা, তাতে আমার মাথাব্যথা নেই । ফিসফিসিয়ে বললেন, ভোরের ঘুমটা ভেঙে সারাদিন তো বেকার করে দিলি।
-বেকার হবেন ক্যানে ডাক্তার বাবু ? আপনি তো সরকারি চাকরি করেন ।সেখানে..... ,তবে বেকার ক্যানে ডাক্তার! আপনাকে না নিয়ে যাচ্ছি না ,সে যে দামেই হোক ,আমার নাম ও...।সারা জীবন আপনার গোলাম হয়ে থাকব কিন্তু আজ এক্ষুণি আপনাকে নিয়ে গিয়ে বাপের চিকিৎসা করাবো'ই করাবো, সে যে কোন শর্তে হোক না কেন ।
এসব কথা শুনে ডাক্তার চ্যাটার্জী বড় মুশকিলে পড়লেন।
-ব্যাটা বলে কি রে, স্পর্ধা তো কম নয়, দেখি, ব্যাটার টাকার গরমটা একটু দেখি , বলে গোলামকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
যেতে পারি তবে একটা সর্তে ,গাড়ি ছাড়া নয় , সে তো অনেকটা পথ আর ভিজিটের সাথে সাথে গাড়ির তেলের খরচ ও গাড়ির ড্রাইভার এর খরচ লাগবে ।পারবি তো ?
-নিশ্চয়ই পাইরবো বাবু নিশ্চয়ই পাইরবো । তবে ওষুধের খরচটা একেবারে ধরে নেন বাবু ।এত ভোরে ওষুধ পাব কোথায় ? আপনার কাছে তো থাকেই ।
ডাক্তার কটমট করে বললেন, ওষুধ থাকে মানে ?-
-না না সবাই বলে... গোলাম কথা ঘুরিয়ে বলল, সবাই আপনার প্রশংসা করছিল। আপনি নাকি ওষুধ ও সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দেন ।আপনার ব্যাগে থাকে কিনা....।
- হ্যাঁ হ্যাঁ সরকারি ওষুধ, তা জানি তাতে কি হয়েছে ? তবে বেসরকারি ভাবে করলে কিছু হয় না।
-সরকারের যা ক্ষমতা তা আপনাদের কিছুই করতে পারবে না ।এসব কথা শুনে একটু হলেও ডাক্তারবাবু গর্ববোধ করলেন । নিজের প্রশংসা কে না চায়! আর বলিস কেন, তোদের জন্যই তো এত দামী দামী ওষুধ..., নয়তো পাবি কোত্থেকে ? আমার কাছে আছে বলেই তো তোদের একটু উপকার হয় ।
-তা তো বটেই ডাক্তার, এই অঞ্চলে বানের জলে ভেসে যাওয়া সব বানভাসি গুলো আপনার উপর নির্ভরশীল। বলেছিস? সত্যি কথা বলতে কি তোদেরকে একটু উপকার করতে পারলে নিজেকে ধন্য বলে মনে হয় ! ডাক্তার হিসেবে সমাজের প্রতি তো একটা দায়বদ্ধতা আছে বৈকি !
-
তা তো ঠিকই বলেছেন ডাক্তারবাবু ।
-এবার মনে মনে বললেন, সরকারি যা আয় তার থেকে ব্যয় বেশি ।যাই হোক চলে যায় ।তবে এটা ঠিক যে "আমার উপর এই ভুবনের ভার" এটা মনে রাখিস তবে খালি হাতে ফিরতে হবে না ।ডাক্তারও পাবি আর ওষুধ ও বলে হো হো করে হাসতে লাগলেন ।
ওদিকে গোলামের বাপের ভূবনডাঙার পাড়ে যাবার সময় হলো যে....
শেষ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন